রাত পোহালেই নির্বাচন । ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ [ডাকসু] নির্বাচনী হাওয়ায় সরগরম ক্যাম্পাস। সকল প্রচারনার কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এবার নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ২১ প্রার্থী। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রার্থী হয়েছেন ১৪ জন, সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে লড়বেন ১৩ জন। ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর প্রতিনিধি হবে এদের মধ্যে থেকে।
এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্যানেল, প্রগতিশীল ছাত্রজোট, স্বতন্ত্র জোট, ইসলামী শাসনতন্ত্র, ছাত্র মুক্তি জোটসহ বেশ কয়েকটি প্যানেলের প্রার্থীরা।
প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা নিয়ে জরীপ করেছে এনএসএ (ন্যাশনাল স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন )। জরীপে দেখা গেছে , নির্বাচনে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দি¦তা হবে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নূরল হক নূর, সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ মনোনীত প্রার্থী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, ছাত্রদলের মোস্তাফিজুর রহমান ও প্রগতিশীল ছাত্র জোটের লিটন নন্দীর মধ্যে । তবে, সংস্থাাটির সার্বে অনুসারে, মূল প্রতিদ্বন্দি¦তা হবে নূরল হক নূর ও রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের মধ্যে।
জরিপের তথ্য অনুসারে, ৪১ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে নূরুল হক নুরের । অপরদিকে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন পাবেন ৩৩ শতাংশ । ছাত্রদলের মোস্তাফিজুর রহমান পাবেন ১৭ শতাংশ। বাকী ভোট ভাগাভাগী হবে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের লিটন নন্দী, স্বতন্ত্র জোটের অরণি সেমন্তি খানসহ অন্যান্য স¦তন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে।
জরিপের তথ্য অনুসারে, সব চেয়ে আলোচনায় রয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ইংরেজি বিভাগের ছাত্র নূরুল হক নূর। আন্দোলন কালীন সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে সহমর্মিতা পেয়েছিলেন শিক্ষার্থীদের। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে প্রতিবাদ আন্দোলনে ভূমিকা ছিল সংগঠনটির।
তারপরেও সার্বিক বিবেচনায় আইন বিভাগের ছাত্র ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন । দল ক্ষমতায় থাকা, হলে একক অবস্থান, জনপ্রিয়তা, কর্মীর কারণে পর্যবেক্ষণে এগিয়ে থাকছে ছাত্রলীগ। তবে,ক্যাম্পাসে ১০ বছরের নির্য়াতন, কোটা আন্দোলনের বিরোধীতা, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের বিপরীত অবস্থানের কারনে পিছিয়ে রয়েছেন তিনি ।
তারপরে আলোচনায় আছেন, ছাত্রদলের মোস্তাফিজুর রহমান। বিগত দশ বছরে দৃশ্যমান কার্যক্রম চালাতে না পারলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরকার বিরোধী এ ছাত্র সংগঠনের ভোটার রয়েছে। যার কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন তারাও। এ প্যানেলর ভিপি প্রার্থী লোক প্রশাসন বিভাগের (সান্ধ্যকালীন) মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি ২০০৯-১০ সেশনে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেন।
আনুষ্ঠানিক ভাবে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দীকে ভিপি প্রার্থী করে পূর্ণ প্যানেল দিয়েছিল প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ঐক্য। কিন্তু পরবর্তীতে মতানৈক্য হওয়ায় ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজীরসহ একটা অংশ স্বতন্ত্র ভাবে নির্বাচনে দাঁড়ান। যার কারণে বাম জোটের এ ভাঙন ভোটে প্রভাব ফেলবে।
এবারের নির্বাচনে ১২টি ছাত্র সংগঠনসহ স্বতন্ত্র মিলিয়ে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রার্থী হয়েছেন ১৪ জন। নির্বাচনে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র এ আর এম আসিফুর রহমান , কোটা সংস্কার আন্দোলনের রাশেদ খান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর মধ্যে। তবে মূল লড়াই হবে ,স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করা গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র এ আর এম আসিফুর রহমান ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের রাশেদ খানের মধ্যে।
চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় লক্ষ্য করা গেছে, উপরের দু’জন ছাড়াও ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজীর, প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ফয়সাল মাহমুদ সুমন, ছাত্রদলের আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক।
জিএস পদে একাধিক শক্ত প্রতিপক্ষ থাকায় তুলনামুলক কম ভোট পেয়ে জিএস নির্বাচিত হতে পারেন এ আর এম আসিফুর রহমান । জরিপের তথ্য অনুসারে, ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এ আর এম আসিফুর রহমানের। অপরদিকে রাশেদ খান পাবেন ২৩ শতাংশ। সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ মনোনীত প্রার্থী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী পাবেন ১৯ শতাংশ । বাকীদের মধ্যে থেকে নারী ভোটারের আধ্যিক্যের কারনে বেনজীরও গোলাম রব্বানীকে ছাড়িয়ে যেতে পারে । ছাত্রদলের অনিকও এ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকবেন না।
তথ্য অনুসারে, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র এ আর এম আসিফুর রহমান ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় ছিলেন দীর্ঘদিন। শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা, খাবার, নানাধরনের হয়রানি, নির্যাতন নিপীড়ন, রেজিস্ট্রার ভবনের দৌরাত্ম্য, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন করে আলোচনায় অনেক আগ থেকেই। যার কারণে ক্যাম্পাসের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনীতি সংশ্লিষ্ট সবার কাছে অন্য রকম পরিচিতি রয়েছে তার। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় বর্ষসেরার রিপোর্টার হওয়ার পাশাপাশি দুইবার সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। শিক্ষার্থীদের সব সমস্যা চিহ্নিত করার সঙ্গে সমাধান কি হতে পারে তা তুলে ধরে অনলাইন-অফলাইনে প্রচারণায়ও সরব রয়েছেন এ প্রার্থী। যে কারনে তার জয়ী হবার সম্মাভাবনা বেশি।
অন্যদিকে, এ আর এম আসিফুর রহমানের পরেই আলোচনায় আছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্লাটফর্ম‘বাংলাদেশ সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার পরিষদের জিএস পদপ্রার্থী রাশেদ খান। অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোর তুলনায় তাদের প্যানেলের বয়স খুবই নগন্য কিন্তু ক্যাম্পাস ও সারা দেশে গত বছরে কোটা সংস্কারকে নিয়ে যে বিশাল আন্দোলন হয়েছে সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকায় তারা ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।
ক্যাম্পাসে বর্তমানে ছাত্রলীগের অবস্থানের কারণে তৃতীয় অবস্থানে থাকবে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী । ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত। প্রচারণায় নিজেকে‘মানবিক ছাত্রনেতা ’হিসেবে উল্লেখ করে ছাপানো লিফলেটে স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে প্রতিশ্রুতি দিলেও কোটা আন্দোলনে বিরোধীতা ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের বিরোধীতা করার কারনে পিছিয়ে আছে সে ।
এরমধ্যে ডাকসুর অন্যতম দায়িত্বপূর্ণ সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন ১৩ জন। সার্বিক বিবেচনায় এই পদে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন প্রার্থী দিলেও ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন থাকছেন এগিয়ে। জরীপ অনুসারে, ছাত্রলীগের শীর্ষ চার নেতার একজনের বাইরেও সাদ্দাম হোসেন ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজের আলাদা একটি বলয় তৈরি করেছেন। যার কারণে এজিএস পদে নিজেকে শক্ত অবস্থান নিয়ে গেলেও অন্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র। একমাত্র কোটাসংস্কার আন্দোলন কারীদের প্রার্থী মো. ফারক হোসেন ছাড়া বাকি প্রার্থীদের অনেকেই অপেক্ষাকৃত ক্যাম্পাসের অপরিচিত মুখ। দলের ভোট থাকলেও ছাত্রদল ক্যাম্পাস ছাড়া হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তেমন মেশার সুযোগ পাননি সংগঠনটির প্রার্থী খোরশেদ আলম। সাংগঠনিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার কারণে অন্য প্রার্থীরা ভোটের মাঠে তেমন প্রভাব ফেলতে পারবেন না। ভিপি, জিএস পদে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পেলেও এজিএস পদে অনেকটাই নির্ভার ছাত্রলীগের সাদ্দাম হোসেন।
২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন তিনি। বিতর্ক অঙ্গন থেকে উঠে আসার কারণে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হওয়ার পরপরই সবার নজরে আসেন। ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বিভিন্ন কথা আসলেও ব্যতিক্রম ছিলেন সাদ্দাম। নিজ সংগঠনের কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়ে কথা বলার চেষ্টা করছেন। প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা লালন করায় শিক্ষক সমাজের কাছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে তার। অনেক শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত পছন্দ থেকেও এজিএস পদে তাকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। তবে শিক্ষার্থীদের আরেকটি অংশ মনে করছেন, কথার ফুলঝুরি নয়, ঘোষিত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের পর মূল্যায়নের কথা ভাবছেন।
এবারের নির্বাচনে ছাত্রলীগের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে কোটাসংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্যানেল। সে হিসেবে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ-বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র ফারক হোসেন এজিএস পদে আলোচনায় রয়েছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব ও ছাত্রলীগের হাতে মারধরের শিকার হয়ে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের সমর্থন পাবেন তিনি- এমনটাই ধারণা করছেন অনেকে।


